রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ রোববার (৭ জুন)। আসামিদের সর্বোচ্চ সাজার আশা পরিবার ও রাষ্ট্রপক্ষের।
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেয়া হয়। ২৪ মে মামলাটি দ্রুত বিচারের জন্য ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
বিচারকের অবকাশকালীন ছুটি বাতিল করে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ১ জুন মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ই আসামির বিরুদ্ধে সোমবার (১ জুন) ধর্ষণ, হত্যা ও মরদেহ গোপনের অভিযোগে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত।
গত ২ জুন মাত্র এক দিনেই এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেন ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। মামলায় রামিসার বাবা, মা, বোন ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৬ জন সাক্ষ্য দেন।
এরপর ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান আসামিরা। সকালে সোহেল ও স্বপ্নাকে কারাগার থেকে আদালত প্রাঙ্গণে এনে রাখা হয় আদালতের হাজতখানায়। বেলা পৌনে ১১টার দিকে সোহেলকে, আর বেলা ১১টার দিকে স্বপ্নাকে হাজতখানা থেকে আদালতে তোলা হয়। ১১টা ১০ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসার পর বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
মামলার সমস্ত অভিযোগ ও সাক্ষীদের জবানবন্দি দুই আসামির সামনে পড়ে শোনান বিচারক। তারপর আসামিদের বক্তব্য শুনতে চান। এ সময় কাঠগড়ায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বৃহস্পতিবার (৪ জুন) যুক্তিতর্কের জন্য দিন নির্ধারণের আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এরপর ৪ জুন উভয়পক্ষের আইনজীবীরা তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
পরে ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ৭ জুন রায়ের দিন নির্ধারণ করা হয়। মাত্র পাঁচ কর্মদিবসে ধর্ষণ-হত্যার মতো একটি মামলার বিচারকাজ শেষ করে নজির স্থাপন করেছে দেশের বিচার বিভাগ। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার কারণেই এ মামলার দ্রুত বিচার সম্ভব হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, সরকারের এই সদিচ্ছা আইন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক ও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আইনজীবীদের মতে, শিশু রামিসার মামলার মতো অন্যান্য ধর্ষণ মামলার বিচারও দ্রুত সম্পন্ন করতে বিশেষ তদন্ত সংস্থা গঠন প্রয়োজন। পাশাপাশি ফরেনসিক বিভাগের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। এতে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, রামিসা হত্যা মামলার মতো দ্রুত বিচার প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রেই দেখতে চাই। তবে এজন্য প্রতিটি মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের মামলাগুলোর তদন্তে আলাদা বিশেষায়িত সংস্থা থাকা প্রয়োজন।
শিশু ধর্ষণ ও সহিংসতার মামলাগুলোতে রামিসার ঘটনা এখন দ্রুত ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নিম্ন আদালতের রায়ের পর উচ্চ আদালতে গিয়ে যেন এসব মামলার বিচার আইনি জটিলতায় আটকে না যায় এবং শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ২৪ মে আদালত পুলিশের দাখিল করা অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ১ জুন অভিযোগ গঠন শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। তদন্তে ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল রামিসা। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে রুমের ভেতরে নেয়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা।
এক পর্যায়ে আসামির ঘরের সামনে শিশুটির একটি স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। ডাকাডাকির পর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং আশপাশের ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর দেখতে পান সোহেল রানার শোবার ঘরের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ। আর তার মাথা পড়ে রয়েছে বাথরুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মরদেহ উদ্ধারের পর স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়।
এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। গ্রেফতার আসামি সোহেল রানা ২০ মে আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।